গণতন্ত্রসহ মানব রচিত সকল ব্যবস্থাই জাহেলিয়াত-চরম অজ্ঞতা। –আমীর, ইসলামী সমাজ

“ইসলামী সমাজ” এর আমীর হযরত সৈয়দ হুমায়ূন কবীর বলেছেন, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ প্রদত্ত ‘ইসলাম’ই মানব জাতির জন্য একমাত্র কল্যাণকর পরিপূর্ণ জীবন ব্যাবস্থা। মানুষের রচিত ব্যাবস্থা মেনে চলার মধ্যে মানুষের জন্য প্রকৃতপক্ষে কোন কল্যাণ নেই।

১০ অক্টোবর, ২০১৩,বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা। রাজধানীর সেগুনবাগিচার ‘সেগুন রেস্টুরেন্ট’। ‘দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ইসলামী সমাজের অবস্থান’ বিষয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে প্রায় ‘ইসলামী সমাজ’। নির্ধারিত সময়ে মঞ্চে এলেন আমির ‘আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধিত্বকারী নেতা’ সৈয়দ হুমায়ূন কবীর। মঞ্চে নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন দলের সদস্য আবু জাফর মোঃ ইকবাল, মোহাম্মদ সোলায়মান কবীর, আকিক হাবিবুজ্জামান, মোহাম্মদ আমীর হোসেন, মোহাম্মদ ইউসূফ আলী। সভার সঞ্চালক দলের ঢাকা মহানগরের দায়িত্বশীল সদস্য মুহাম্মদ ইয়াছিন সংক্ষিপ্ত স্বাগত বক্তব্য শেষে মাইক তুলে দেন দলের আমির ‘আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধিত্বকারী নেতা’ সৈয়দ হুমায়ূন কবীর সাহেরের হাতে। আমির খোলাখুলিভাবে বললেন, গণতন্ত্রের মধ্যে মুসলমানদের জন্য কোনো কল্যাণ নেই। তাই আসুন গণতন্ত্রকে এদেশ থেকে বিদায় করি। তিনি বলেন, অনেক ইসলামী দল এদেশে নির্বাচন পদ্ধতি স্বীকার করে নিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এ ধরনের ইসলামী দলের মাধ্যমে এদেশে কোনোদিনই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে না। কারণ, গণতন্ত্র স্বীকারকারীরা ইসলামের মধ্যেই থাকে না। তিনি বলেন, কেবল গণতন্ত্রের অনুসারীরাই নয়, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য যারা সশস্ত্র জিহাদের পথে হাঁটছে, জঙ্গিবাদের দীক্ষা নিয়েছে তারাও ভ্রান্তির মধ্যে আছে। ইসলামে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লড়াইয়ে নামার অনুমতি নেই। রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়ে লড়াইয়ের উদাহরণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হিজরতের পর রাখলেও রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার জন্য তিনি ‘ক্ষমা ও সবর’-এর নীতি অবলম্বন করেছেন। তিনি বলেন, এরই মধ্যে যারা জঙ্গি হয়েছেন তারা মূলতঃ ইসলাম বোঝেন না। তারা আবেগের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছেন।

তার বক্তব্যের এ পর্যায়ে সেগুন রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করেন শাহবাগ থানার ওসি (তদন্ত) এমএ জলিল। সঙ্গে পুলিশ ও ডিবির একটি দল। তারা বসে পড়েন সভাকক্ষের একদিকে। তখন অনুষ্ঠানের সঞ্চালক তাদের চাহিদামত লিফলেট, গঠনতন্ত্র দিয়ে তাদের সহযোগীতা করেন। এদিকে বক্তৃতা চালিয়ে যান আমির। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে বিশ্বে ৬২টি মুসলিম দেশ থাকলেও কোনো দেশেই প্রকৃত ইসলাম নেই। কোনো দেশে আছে জনগণের সার্বভৌমত্ব, কোথাও রাজতন্ত্র, কোথাও মানুষের তৈরি অন্য কোনো তন্ত্র। প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম কথা হলো দেশটির ক্ষমতায় যারা আছেন তারাসহ জনগণকে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করতে হবে। মানুষের তৈরি সব বিধান অস্বীকার করতে হবে। আল্লাহর কোরআন ও রাসূলের দেখানো পথে রাষ্ট্র পরিচালিত হতে হবে। তিনি দাবি করেন, যেহেতু বাংলাদেশের মানুষ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেয় না, আল্লাহর কর্তৃত্ব স্বীকার করে না, দেশের সংবিধানে ‘সার্বভৌমত্বের মালিক জনগণ’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেজন্যই দিন দিন সমস্যা বর্তমান অবস্থায় চলে এসেছে। মানুষের সার্বভৌমত্বে আস্থা রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে ১৮ দলীয় জোট ও ১৪ দলীয় জোট এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। ক্ষমতাসীন জোট মনে করছে, আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে না আসতে পারলে তাদের অস্তিত্ব থাকবে না। একইভাবে ১৮ দলীয় জোট মনে করছে, আসন্ন নির্বাচনে পরাজিত হলে তাদেরও অস্তিত্ব থাকবে না। আমির প্রশ্ন রাখেন, নির্বাচনের পথে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট ক্ষমতায় এলে দেশের অবস্থা আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, এ জোটও ক্ষমতাসীন জোটের মতো ইসলামকে ব্যক্তি জীবনে পালনের বিষয় মনে করে, রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলাম পালনে ইচ্ছুক নয়।

প্রায় দেড় ঘণ্টার দীর্ঘ বক্তৃতায় ইসলামী সমাজের আমির রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার পন্থা ব্যাখ্যা করেন। বলেন, প্রত্যেক মুসলমানকে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করতে হবে। জনগণের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করতে হবে। আল্লাহ ও রাসূল নির্দেশিত পথের বাইরে সব বিধান অমান্য করতে হবে। এভাবে চললে এক সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা থাকবেন তারা তাদের কোনো আইনই মানুষকে মানতে বাধ্য করতে পারবে না। এতে এক পর্যায়ে শাসকরা মানুষের ওপর নানা ধরনের জুলুম-নির্যাতন শুরু করবে। তখন মুসলমানদের রক্ষায় আল্লাহ নিজে মুমিনদের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়ে দেবেন। যেভাবে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ক্ষমতা দিয়েছিলেন তিনি। যেভাবে হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে আগুন থেকে রক্ষা করেছিলেন। যেভাবে হযরত মুসা (আ.) ও তার অনুসারীদের নীল নদে কুদরতি রাস্তা তৈরি করে দিয়ে পার করে নিয়ে গিয়েছিলেন সেভাবেই ঈমানদারদেরকে তিনি জালিমদের নিকট হতে রক্ষা করবেন।
প্রশ্নোত্তর পর্বে ইসলামী সমাজের আমির বলেন, আমরা নতুন সংগঠন নই। রাজনৈতিক দল হিসেবে ১৯৯৭ সালের ১৭ মে আমরা যাত্রা শুরু করি। দলের প্রতিষ্ঠাতা আমির ছিলেন মুফতি আবদুল জব্বার। ২০০৬ সাল থেকে এই সংগঠনের আমিরের দায়িত্ব পালন করে আসছি। আমাদের দলে কোনো পদ-পদবি নেই। দলে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধিত্বকারী নেতা হিসেবে একজন আমির থাকেন। আর থাকেন সদস্য। যারা এই দলের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে যোগ দেন তারা আমাদের সদস্য। ১৬ বছরে আমাদের সদস্য সংখ্যা কয়েক হাজারে উন্নীত হয়েছে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে আমির বলেন, প্রচলিত ধারা অনুযায়ী ইসলামী সমাজ কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তবে প্রকৃতপক্ষে আমরাই রাজনৈতিক দল। এজন্য আমাদের দলের কোনো নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই। আমরা কখনও নিবন্ধনের পথে যাব না। তিনি বলেন, আমাদের সংগঠন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয় রাষ্ট্রের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলে। এজন্যই এ পর্যন্ত আমরা যাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি তাদের বেশিরভাগই বলেছে আমরা সঠিক কথা বলছি। আমাদের পথই প্রকৃত ইসলামের পথ।
দুপুর দেড়টায় শেষ হয় ইসলামী সমাজের মতবিনিময় সভা। সভা শেষে শাহবাগ থানার ওসি (তদন্ত) এমএ জলিল দলের আমিরকে বলেন, আপনারা কোনো ধরনের অনুমতি না নিয়ে মতবিনিময় সভা করেছেন। আপনাদের বিষয়ে আমরা অবহিত নই। আপনারা কবে থেকে কোন উদ্দেশ্যে এই সংগঠন করছেন ওসি স্যার তা জানেন না। চলেন ওসি স্যার আপনাদের সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে আলাপ-আলোচনা করবেন।

বেলা ঠিক ১টা ৩০ মিনিট। ইসলামী দলের আমিরসহ সভায় উপস্থিত ইসলামী সমাজের আমীর সহ ৭জন সদস্যকে নিয়ে শাহবাগ থানার উদ্দেশে যাত্রা করেন শাহবাগ থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে গোয়েন্দা ও পুলিশের একটি যৌথ টিম।

দীর্ঘ পাঁচ ঘন্টা ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে চা দ্বারা আপ্যায়ন করে তাদেরকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হয়। উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে একইভাবে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইসলামী সমাজের সদস্যদেরকে জঙ্গি ও জামায়াত সন্দেহে আটক বা গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু ব্যাপক তদন্তের পর কোন অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের ছেড়ে দেয়া হয় অথবা দায়ের করা মামলা খারিজ হয়ে যায়।

পরদিন ১১ অক্টোবর ইসলামী সমাজ এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আজ এক কর্মী সভায় সংগঠনের আমীর সৈয়দ হুমায়ূন কবীর আটককৃত সকলকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়ায় আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন। কর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সর্বাবস্থায় আমাদের সকলকে নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতি ঈমানে দৃঢ় থেকে উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। এবং সকল ক্ষেত্রে একমাত্র মহান রব্বের উপর নির্ভর করতে হবে।
তিনি দেশবাসী সকলকে সংঘাত ও সংঘর্ষের পথ পরিত্যাগ করে ‘মানুষের নয়, সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ’র এ মহাসত্যের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠার দাওয়াতী আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান।

মানবতার কল্যাণে বার্তাটি শেয়ার করুন-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *