দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তি

আল্লাহ্’র মনোনীত দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তি এবং বিভ্রান্তি নিরসনে আমাদের করণীয়

-আবু যারীফ

সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মহান রব্ব আল্লাহ্'র একক সার্বভৌমত্ব এবং ইসলামের আইন-বিধান প্রতিষ্ঠায় ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভ করা একান্ত প্রয়োজন। আর তাই আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ নাবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব এবং সত্য দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করার পর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে দায়িত্ব যেভাবে পালন করেছেন, যে পদ্ধতিতে পালন করেছেন, আজকের যুগের দা‘ঈ-ইলাল্লাহদের সে ভাবেই পালন করতে হবে। তিনি ঈমানের দাওয়াত, ইসলামের দাওয়াত যে ভাবে, যে শব্দ দ্বারা দিয়েছেন আমাদেরকে সে ভাবেই দিতে হবে। তিনি তাঁর উপস্থাপিত দাওয়াতে ঈমান ও ইসলামকে যেভাবে আন্তরিক উপলব্ধি, বিশ্বাস, আক্বীদাহ এবং সালাত, সিয়াম ও হজ্জের ন্যায় আধ্যাত্বিক আমলের সাথে সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক জীবন ব্যবস্থা হিসেবেও তুলে ধরেছিলেন আমাদের উপস্থাপনায়ও ঈমান ও ইসলামকে তদরূপ তুলে ধরতে হবে। আল্লাহ্’র রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দাওয়াতে কুরাইশদের বলতেন-

“তোমরা আমার একটি কথা যদি মেনে নাও, তাহলে আরব ও আযম (অনারব) তোমাদের করতলগত হবে। আমি তোমাদের সামনে এমন একটি কালিমা পেশ করছি তা যদি তোমরা গ্রহণ করো, তাহলে তোমরা সমগ্র আরব ও আযম জয় করে ফেলবে এবং অনারবরা তোমাদেরকে জিঝিয়া দিবে।” (সিরাতে ইবনে হিশাম, তাফসীর ইবনে কাসীর, আর রাহীকুল মাখতুম পৃ.১৫৬, তাওহীদ পাবলিকেশন্স)

মুসলিমদেরকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে আল্লাহর একক সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য আল্লাহ্ একটি ব্যবস্থা প্রদান করেছেন যার নাম খিলাফত। খিলাফত হচ্ছে ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থার নাম, খিলাফতের শাসন ব্যবস্থা বিশ্বের অন্য সকল শাসন ব্যবস্থা সমূহের ভিত্তি, চিন্তা, ধারণা, গঠন, কাঠামো, আইন, সংবিধান সহ সকল দিক ও বিভাগ থেকে পৃথক ও স্বতন্ত্র। ইসলামের খিলাফত ব্যবস্থা আল্লাহ প্রদত্ত একটি স্বতন্ত্র শাসন ব্যবস্থা যা কোন ক্রমেই রাজতান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদী, ফেডারেল, প্রজাতান্ত্রিক কিংবা গণতান্ত্রিক নয়। খিলাফত প্রসংগে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন বলেন-

“আর সেই সময়ের কথাও একটু স্মরণ করে দেখ, যখন তোমাদের রব্ব ফেরেশতাদেরকে বলেছিলেন, “আমি পৃথিবীতে একজন খলীফা নিযুক্ত করতে যাচ্ছি।” (সূরা আল বাকারা ২:৩০)

এ আয়াতে খলীফা দ্বারা বুঝানো হচ্ছে- “মহান রব্ব আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিনিধি হওয়া”। এ অর্থ অনুযায়ী সকল আদম সন্তান খিলাফতের দায়িত্ব প্রাপ্ত।

আল্লাহ পাক অন্যত্র বলেন-

“(আমি তাকে বললাম) হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলিফা নিযুক্ত করেছি, কাজেই তুমি জনগণের মধ্যে সত্য সহকারে শাসন কর্তৃত্ব পরিচালনা করো এবং প্রবৃত্তির কামনার অনুসরণ করো না, কারণ তা তোমাকে আল্লাহ্’র পথ থেকে বিপথগামী করবে যারা আল্লাহ্’র পথ থেকে বিপথগামী হয় অবশ্যই তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি, যেহেতু তারা বিচার দিবসকে ভুলে গেছে।” (সূরা সোয়াদ ৩৮:২৬)

আয়াতটিতে খলীফা দ্বারা বুঝানো হচ্ছে এমন এক শাসককে যিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় মহান রব্ব আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে তাঁর প্রদত্ত শরীয়াতের বিধান মোতাবেক তার প্রতিনিধিত্বের যথাযথ হক্ব আদায় করেন।

আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন তাঁর জমীনে তাঁর মনোনীত একমাত্র দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা ও প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যে বান্দাদের মধ্য হতে কাদেরকে খিলাফতের দায়িত্ব প্রদান করবেন সে সম্পর্কে অন্যত্র ফরমান-

‘‘তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে খিলাফত (রাষ্ট্রক্ষমতা বা শাসনকর্তৃত্ব) দান করবেন যেমন তিনি খিলাফত (রাষ্ট্রক্ষমতা বা শাসনকর্তৃত্ব) দান করেছিলেন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে এবং তাদের জন্য মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে দিবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের (বর্তমান) ভয়-ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। তারা শুধু আমার ইবাদাত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর যারা এরপর কুফরী করবে তারাই ফাসেক।’’ (সূরা আন নূর ২৪:৫৫)

খিলাফত প্রসংগে হযরত হুযায়ফা (রাযিআল্লাহু আনহু) বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“তোমাদের মধ্যে নবুওয়াত থাকবে যতদিন আল্লাহ ইচ্ছা করেন। অতঃপর তা উঠিয়ে নেবেন। এরপর নবুওয়াতের তরীকায় খেলাফত কায়েম হবে। আল্লাহ পাক যতদিন ইচ্ছা তা রেখে দেবেন। অতঃপর উঠিয়ে নেবেন। অতঃপর অত্যাচারী রাজাদের আগমন ঘটবে। আল্লাহ পাক স্বীয় ইচ্ছামত তাদেরকে বহাল রাখবেন। তারপর উঠিয়ে নিবেন। অতঃপর জবর দখলকারী শাসকদের যুগ শুরু হবে। আল্লাহ পাক স্বীয় ইচ্ছামত তাদেরকে বহাল রাখবেন। অতঃপর উঠিয়ে নেবেন। এরপরে নবুওয়াতের তরীকায় পুনরায় খেলাফত কায়েম হবে। এই পর্যন্ত বলার পর আল্লাহ’র রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চুপ হয়ে গেলেন” (মুসনাদে আহমাদ হা/১৮৪৩০, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৫; মিশকাত হা/৫৩৭৮)।

হাদীসটিতে খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ দু’বার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। প্রথম খিলাফত হযরত রসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওফাতের পর এবং দ্বিতীয় খিলাফত মুসলমানদের চরম অবনতির পর।

নবুওয়ত, খিলাফতে রাশেদা, যন্ত্রণদায়ক বংশের শাসন সবই শেষ হয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে আমরা শাসন ব্যবস্থার যে ধাপে বা কালে (Stage) অবস্থান করছি তা হল জুলুমের শাসন। খিলাফতে রাশেদা বলতে আমরা প্রথম চার খলিফার সময় কালকে বুঝে থাকি। যন্ত্রণাদায়ক বংশের শাসন বলতে বুঝানো হয় খিলাফতের সেই সময় কাল যখন জোর পূর্বক বাইয়াত গ্রহণ করা হতো এবং উত্তরাধিকার সূত্রে বাইয়াত হস্তান্তর করা হতো। এক কথায় বাইয়াত ব্যবস্থার অপব্যবহার ও শরীয়তের অপব্যবহারকে বুঝানো হয়েছে। জুলুমের শাসন বলতে সেই শাসন কালকে বুঝানো হয়েছে যখন ইসলামী শাসন ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল কিন্তু শাসকগণ শরীয়তের অপপ্রয়োগ করে জনগণের উপর অত্যাচার করতো এবং বর্তমান সময়ের শাসন ব্যবস্থা যেখানে মুসলিম নামধারী শাসকগণ কুফুরী ব্যবস্থা দ্বারা মুসলমানদেরকে শাসন করছে। হাদিসের শেষে মুসলিম উম্মাহকে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে এই বলে যে, জুলুমের শাসনের অবসান ঘটবে এবং পুনঃরায় নবুওয়তের আদলে খিলাফত ফিরে আসবে।

আল্লাহ্’র ওয়াদার উপর পরিপূর্ণ আস্থা রেখে ঈমানদারগণের প্রস্তুতি গ্রহণ একান্ত জরুরী। কারণ আজকে আমাদের সম্মুখে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের যে দ্বীন বিদ্যমান তার নাম হচ্ছে ইসলাম। আর আল্লাহ এ দ্বীনকে সকল প্রকার বিধি-বিধান ও নিয়া’মত সহকারে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। শুধুমাত্র আমাদের অজ্ঞতা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই এ দ্বীন প্রতিষ্ঠিত নেই। সুতরাং আজ মুসলিম উম্মাহর সর্ব প্রথম এবং সর্ব প্রধান কাজ হচ্ছে আল্লাহকে একমাত্র রব্ব-সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা-মেনে নিয়ে রাব্বুনাল্লাহু ঘোষণা দিয়ে পরিপূর্ণ ঈমানদার হয়ে যাওয়া এবং এ ঈমানের উপর দৃঢ়-অটল থাকা। আর এই ঈমানের ভিত্তিতে আমলে সালেহ্ করার মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে নিজ নিজ পরিবারের মধ্যে পরিপূর্ণরূপে দ্বীন প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। অতঃপর ইসলামী শরীয়াহ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করার তথা খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সকল প্রকার তাগুতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে জাতির মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দাওয়াত দেওয়া। কেননা আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন সন্তুষ্ট হয়ে তাদের মাঝেই খিলাফত ফিরিয়ে দিবেন যারা ঈমান ও আমলে সালেহ’র গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেদের ব্যক্তি পর্যায়ে দ্বীনকে খালেছভাবে গ্রহণ করবেন।

তবে ব্যক্তিগত বুঝের ভিত্তিতে অনেক মুসলিম ভাই বলে থাকেন,“আগে নিজের দেহে ইসলাম কায়েম করুন, তখন আপনা-আপনি দেশে ইসলাম কায়েম হয়ে যাবে” কিংবা “সারা বাংলাদেশে দ্বীন কায়েম হলেও আমার কোন লাভ হবে না যদি আমার সাড়ে তিন হাত শরীরে (পোষাক-পরিচ্ছদে) দ্বীন কায়েম না হয়, আমার নিজ পরিবারে দ্বীন কায়েম না হয়” কিংবা “যারা সালাতেই সুন্নাহ্’র অনুসরণ করেন না, তারা আবার কিসের ইসলাম কায়েম করবে?” (অর্থাৎ যারা সালাতে তাকবীরে তাহরীমার অতিরিক্ত রফে ইয়াদাইন ও জোরে আমীন ইত্যাদি সুন্নাহ পালন করেন না, তারা আবার কি ইসলাম কায়েম করবে?)। এসব আসলে দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার পথে কখনোই প্রতিবন্ধক হিসেবে ছিল না; নিজেদের অক্ষমতা তথা পলায়নপর মানসিকতাকে আড়াল করার জন্যই আজ এসব প্রশ্নের আমদানী হয়েছে!

সুতরাং মূলকথা হলো- “আমরা যদি নিজেদের চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাস ও ঘোষণায় পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারি, অতঃপর নিজেদেরকে ভালো, আদর্শ ঈমানদার মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, ঈমান ও চরিত্রের বিপ্লবের মাধ্যমে নিজেদেরকে সংশোধন করতে পারি, ঈমানের ভিত্তিতে আমালে সালেহ্কারী হতে পারি, তাহলে আল্লাহ্’র ইচ্ছায় একদিন আমরা খিলাফাহ/শাসন ক্ষমতা লাভ করবো-ই”। যার দলীল (সূরা আন্ নুর ২৪:৫৫) ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতটি একটি আম (সাধারণ) আয়াত যেখানে ঈমানদার ও আমালে সালেহ্কারীদের জন্য আল্লাহ্’র ওয়াদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোন পদ্ধতিতে খিলাফাহ্ কায়েম করার চেষ্টা করতে হবে কিংবা কোন পদ্ধতিতে দ্বীন বিজয়ী হবে তা স্পষ্ট করে এই আয়াতে উল্লেখ হয়নি। তাছাড়া সঠিকভাবে ঈমান আনা আর আমালে সালেহ করা বলতে কি বুঝনো হয়েছে সেটা অবশ্য বুঝার প্রয়োজন আছে। ঈমান আনা বলতে মূলতঃ শির্ক মুক্ত হয়ে আল্লাহ্’কেই একমাত্র রব্ব- সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের মালিক মেনে আল্লাহ্’র একত্ববাদে ঈমান আনা বুঝায়, ঈমানের দাবী তথা ইসলামের সকল শর্তগুলি পূরণ করা বুঝায়, ঈমান বিনষ্টকারী কাজগুলি থেকে বেঁচে থেকে ঈমানের উপর মৃত্যু বরণ করা বুঝায় যা শুধু খিলাফত লাভের শর্ত নয় বরং সেটা মুসলিম থাকারও শর্ত। আয়াতে উল্লেখিত আমালে সালেহ্-এর মধ্যে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহও অন্তর্ভুক্ত। নুসরাহ্ অন্বেষণ করাও এর অন্তর্ভুক্ত। এমনকি কলমের মাধ্যমে কিংবা বক্তৃতার মাধ্যমে জিহাদও এই আমালে সালেহ্-এর অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে হারাম, শির্ক ও কুফরের ছোঁয়া সম্বলিত মানুষের সার্বভৌমত্বের অধীনে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয় লাভের পর সংসদ সদস্য হয়ে, মন্ত্রী হয়ে সূরা মায়েদার ৫:৪৪ নম্বর আয়াতকে ভুলে গিয়ে কুরআন ও সুন্নাহ্’র হুকুমের বিরুদ্ধে গিয়ে স্বচ্ছল ও বিত্তবান হওয়ার পরও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা নেয়া, দ্বীন কায়েমের কথা বলে শুল্কমুক্ত গাড়ী, সরকারী ফ্ল্যাট, প্লট, বাড়ীর মালিক বনে যাওয়া, তাগুতী আইনে মন্ত্রনালয় পরিচালনা করে ইসলামকে বিজয়ী করার চেষ্টা করা কোনক্রমেই আমালে সালেহ-এর অংশ হিসেবে গণ্য হবে না।

সুতরাং সকল প্রকার ব্যক্তিগত ইখতেলাফকে নিজের মাঝে সীমাবদ্ধ রেখে আমাদের নিজেদের ব্যক্তি জীবনকে র্শিক, কুফর থেকে বাঁচিয়ে, স্বীয় নফ্সের তাড়নাকে প্রাধান্য না দিয়ে সুন্নাহ্ মোতাবিক গঠন করতে উদ্যমী হতে হবে এবং স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, বাবা, মা, ভাই, বোন সহ নিজ অধীনস্ত ও নিকটজনের মাঝে মহান রব্বের দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা এবং রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ’র দাওয়াত পৌঁছানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হবে। কারণ যিনি নিজ পরিবার ও সমাজে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উদাসীন তিনি কিভাবে বৃহৎ পরিসরে দ্বীন কায়েমে ভূমিকা রাখবেন?

ইতিপূর্বেই আমরা উল্লেখ করেছি, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জন তথা ক্ষমা ও জান্নাত লাভের লক্ষ্যে নিজেদের অর্থ ও সময় ব্যয়ের মাধ্যমে সকল মানুষের কল্যাণে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করাই ঈমানদারগণের ঈমানের সর্বোচ্চ দাবী এবং মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন তথা ইসলামের আইন-বিধান প্রতিষ্ঠা করতে হলে ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা (খিলাফত) লাভ একান্ত প্রয়োজন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আল্লাহ্র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঈমানদারগণের রাষ্ট্রক্ষমতা বা খিলাফত লাভের সঠিক পদ্ধতি কোনটি?

কারণ ইসলামের নামে বিভিন্ন ব্যক্তি ও দল বিভিন্ন পদ্ধতি আবিস্কার করে সে পদ্ধতির মাধ্যমে ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভ তথা খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন প্রতিষ্ঠায় ঈমানদারগণের রাষ্ট্রক্ষমতা বা খিলাফত লাভের সহীহ্ পদ্ধতি সম্পর্কে পাঠকদের অবগত করাটা লেখক হিসেবে ঈমানী দায়িত্ব মনে করছি। কুরআন ও সহীহ্ হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণীত সত্য যে, বর্তমানে দুনিয়াতে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমনের মধ্য দিয়ে নবুওয়তের দরজা কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। তিনিই হচ্ছেন আল্লাহ প্রেরীত সর্বশেষ নাবী ও রাসূল। সুতরাং নাবী ও রাসূলগণের অনুপস্থিতিতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার এ দাওয়াতের দায়িত্ব এখন উম্মতের উপরই বর্তায় এবং এ উম্মতকেই আল্লাহর একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মহান আল্লাহ’কে রব্ব হিসেবে ভুলে যাওয়া মানুষকে তার প্রকৃত রব্ব আল্লাহ্’র সাথে স¤পর্ক স্থাপন করাতে হবে। অন্ধকার থেকে মানুষকে বের করে আলোর দিকে টেনে আনতে হবে। আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার দাওয়াতের এ কঠিন ও উচ্চ মর্যাদাশীল কর্মকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কিয়ামত অবধি নাবী ও রাসূলগণের শূন্যতা এ উম্মতকেই পূরণ করতে হবে। আর মনে রাখতে হবে, আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্বের প্রতি দাওয়াতের জন্য একমাত্র আদর্শ ও ইমাম হলো, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি যেভাবে মানুষকে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্বের প্রতি দাওয়াত দিয়েছিলেন, তার হুবহু অনুসরণই হল দাওয়াতি ময়দানে সফলতার চাবিকাঠি। তিনি মানুষকে মহান রব্ব আল্লাহ্’র সাথে স¤পর্ক স্থাপন, আল্লাহর জমীনে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও দ্বীন কায়েমের লক্ষ্যে যেসব হিকমত, কৌশল, প্রজ্ঞা, মেধা, বুদ্ধি ও পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, তা-ই হল এ উম্মতের দা‘ঈ, আলেম ও জ্ঞানীদের জন্য একমাত্র আদর্শ। কারণ যারা আল্লাহর জমীনে আল্লাহ্’র মনোনীত একমাত্র দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা ও প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রদর্শিত পথ ও পদ্ধতি অনুসরণ করবে না তারা কখনোই সফলতা অর্জন করতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ ফরমান-

“তোমাদের জন্য আল্লাহ্’র রাসূলের মধ্যে রয়েছে একটি উত্তম আদর্শ; এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহ্ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহ্কে বেশী বেশী করে স্মরণ করে।” (সূরা আল্ আহযাব ৩৩:২১)

“যে ব্যক্তি তার নিকট সত্য-সঠিক পথ প্রকাশিত হওয়ার পর রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করবে এবং ঈমানদানদের অনুসৃত পথ-পদ্ধতির পরিবর্তে ভিন্ন পথ-পদ্ধতির অনুসরণ করে, আমি তাকে ঐ দিকেই পরিচালিত করবো যে দিক সে ধাবিত হয়েছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো। গন্তব্যস্থল হিসেবে যা খুবই নিকৃষ্টতম।” (সূরা আন নিসা ৪:১১৫)

আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাচ্ছি, যারা ক্বিতাল বা সশস্ত্র সংগ্রাম, বোমাবাজি কিংবা সেনা ক্যু’র মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন, আবার যারা ‘গণতন্ত্র’ কিংবা ত্বগুতি ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন করে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভের বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা স্পষ্টতঃই বিভ্রান্তিতে আছেন। ভুল নেতৃত্ব কিংবা কুরআন ও সুন্নাহ্’র যথাযথ দলিল হাতে না আসার কারণে তারা হয়তো জানেনই না যে, এসবের কোনটিই ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভের পদ্ধতি নয়।

এসব পদ্ধতি বাতিল হওয়ার কারণসমূহঃ

১) সশস্ত্র সংগ্রাম, বোমাবাজি আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন মনোনীত দ্বীন-ইসলাম সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠার জন্য যেসকল আলেম সশস্ত্র জিহাদ বা ক্বিতালের কথা বলে থাকেন তারা দলিল হিসেবে কিছু সহীহ হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন। যেমন সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আবু বছীর (রাযিআল্লাহু আনহু) এর ঘটনা। যেখানে হুদাইবিয়ার সন্ধির পর সন্ধির একটি ধারা অনুযায়ী মক্কা থেকে হিজরত করে আসা মুসলিমদেরকে মদীনা থেকে মক্কায় ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর আবু বছীর (রাযিআল্লাহু আনহু) মদীনাতে হিজরত করেন। এ সংবাদ পেয়ে কাফিরদের পক্ষ থেকে দু’জন দূত তাকে নিতে আসলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে তাদের হাতে তুলে দেন। পথিমধ্যে যুল হুলায়ফা নামক স্থানে তিনি তাদের একজনকে হত্যা করেন এবং আবার মদীনাতে ফিরে আসেন। তাঁকে দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কি আশ্চর্য! এ তো যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে সক্ষম। যদি এর সাথে কেউ থাকতো! এ কথা শুনে আবু বছীর (রাযিআল্লাহু আনহু) বুঝতে পারেন যে, তাকে আবার মুশরিকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। তাই তিনি বের হয়ে পড়েন এবং সিফাল বাহর নামক এলাকাতে অবস্থান নেন। পরবর্তীতে মক্কা থেকে হিজরত করে মুসলিমরা একের পর এক এসে আবু বছীর (রাযিআল্লাহু আনহু) এর সাথে মিলিত হতে থাকেন। মক্কার মুশরিকদের কোনো ব্যবসায়ী কাফেলা ঐ এলাকা দিয়ে ফিরছে এমন সংবাদ পাওয়া মাত্র তারা তাদের উপর হামলা করে তাদের হত্যা করতেন এবং গণীমতের মাল সংগ্রহ করে তদ্বারা জীবনধারণ করতেন। এ সংকট থেকে উদ্ধার পেতে পরবর্তীতে মক্কার কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট পত্র লিখে সন্ধির উক্ত শর্তটি বতিল করার অনুরোধ জানায়। (সহীহ বুখারী)। এই হাদীসটিতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়, যথা- আমীর বা খলীফা অনুপস্থিত থাকলে বা তাঁর সাথে যোগাযোগ সম্ভব না হলে স্থানীয়ভাবে সামর্থানুযায়ী শত্রুদের নির্যাতনের জবাব দেয়া যায়। কেননা আবু বছীর বা অন্য যেসব সাহাবা উক্ত স্থানে একত্রিত হয়েছিলেন তাদের কেউই খলীফা ছিলেন না। আবার তারা মদীনা রাষ্ট্রের অনুগত নাগরিকও ছিলেন না। তারা যা করেছেন সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের নির্দেশও দেন নি। এসকল সাহাবাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা নিয়ন্ত্রিত ভূখন্ডও ছিল না। এসব বিষয় স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, কোন মজলুম মু’মিন যদি তার উপর কৃত জুলুমের প্রতিবাদস্বরূপ সামর্থানুযায়ী প্রতিরোধ করতে পারে এজন্য সে ভূখণ্ডে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে এটা শর্ত নয়। এর দলিল হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট যখন এ খবর পৌঁছেছিল, তখন কিন্তু তিনি এর নিন্দা করেননি। বরং উৎসাহ্ দিয়ে বলেছিলেন, “যদি এর সাথে কেউ থাকতো!”

এ হাদীস দ্বারা আত্মরক্ষার্থে জিহাদ করার অনুমোদন আছে তা প্রমাণীত হলেও দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র জিহাদের সম্পর্ক প্রমাণীত হয় না। কারণ সংশ্লিষ্ট সাহাবীরা যা করেছিলেন তা দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল না; বরং তা অনন্যোপায় হয়ে আত্মরক্ষার্থে ছিল।

অপর এক হাদীসে হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট হতে অঙ্গিকার নিয়েছিলেন যে, আমরা ক্ষমতাশীনদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবো না, যতক্ষণ না তারা স্পষ্ট কুফরীতে লিপ্ত হয়, যে বিষয়ে আমাদের নিকট আল্লাহ্’র পক্ষ হতে প্রমান বিদ্যমান আছে। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

এই হাদীসের মূল ভাষ্য হলো ক্ষমতাশীন খলীফা বা বাদশাহ্ যদি কুফরীতে লিপ্ত হয় তবে তখনি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ওয়জিব হবে। যা ইসলাম প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরবর্তী আমল।

সহীহ হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, জিহাদ জারি থাকবে কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত । তবে পৃথিবীতে কোথাও পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না থাকা অবস্থায় আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য সশস্ত্র জিহাদ বা ক্বিতাল করার কোনরূপ নির্দেশ আল্লাহ্’র কিতাব আল-কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহীহ্ হাদীসে নেই সুতরাং এটি সংগত কারণেই বাতিল পদ্ধতি।

২) সেনা ক্যু নূসরাহ্’র নামে সেনাবাহিনীর সদস্যদের দ্বারা ক্যু’র মাধ্যমে জোরপূর্বক ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভের ধারণাটিও নব্য জাহিলিয়্যাত ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দানের ব্যাপারে আল্লাহ্’র চূড়ান্ত ওয়াদা থাকা সত্ত্বেও যারা আল্লাহ্’র ওয়াদার উপর ভরসা না করে কেবলমাত্র মানুষের নূসরাহ্’র মুখাপেক্ষী হয়, আল্লাহ্ তাদের উপর থেকে স্বীয় জিম্মাদারী তুলে নিয়ে তাদেরকে তাদের নিজ শক্তি-সামর্থের উপর ছেড়ে দেন, ফলে আল্লাহ্’র গায়েবী মদদ বা বিশেষ সাহায্য তাদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। পরিণতিতে আপাতদৃষ্টিতে তাদের কর্মকান্ড ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য উপযোগী ও বাস্তবসম্মত মনে হলেও বাস্তবে সংকট ডেকে আনা ব্যতীত ভিন্ন ফল দেয় না। উপরন্তু দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ জনগণ তাদের আচরণে দিনকে দিন ইসলাম বিরোধী হয়ে পড়ে এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার কর্মীদের সাথে সচেতন ভাবেই শত্রুতা প্রকাশের পাশাপাশি তাদের ঠেকাতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে একাট্টা হয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করে।

৩) মানব রচিত ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন- আমাদের মধ্যে ইসলামের এমন কঠিন জিম্মাদারদের উদ্ভব হয়েছে যারা মনে করে থাকেন যে, তারা মারা গেলে কিংবা বন্দী হলে ইসলামকে এগিয়ে নিবে কে? সুতরাং বর্তমান জাহিলি সমাজ ব্যবস্থায় ‘ইসলাম’কে টিকিয়ে রাখতে হলে কুফরের সাথে সমঝোতা করা ছাড়া উপায় নেই। তারা আরো মনে করেন যে, ইসলামকে রক্ষার জন্য একটু ইসলাম বিরোধী কাজ করলে বা একটু ইসলাম বিসর্জন দিয়ে হলেও নিজেদেরকে রাজনীতির ময়দানে বাঁচিয়ে রাখা উচিত।
তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, বিপদের সময়ে ইসলামকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাফিরদের তৈরী কুফরী রাস্ট্র ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা যায় এবং জমীনের বুকে ইসলামকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরাসরি প্রচলিত কুফরী ব্যবস্থার বিরোধীতা না করে, ইসলামের বিভিন্ন বিধি-বিধানে কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও সংসদে গিয়ে জাতির মুসলমানদের জন্য একটু একটু করে ইসলাম আনতে পারলে ক্ষতি কী?
আরও প্রমান করার চেষ্টা করেন যে, ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও মুসলিমদের বিজয়ের লক্ষ্যে মানুষের সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা এবং জাহিলিয়্যাতের নেতৃত্বে মেনে নিয়ে জাহিলিয়্যাতকামী দলসমূহের সাথে জোট, ভোট করাটা নাজায়েজ হবে না। অথচ প্রকৃত সত্য এটাই যে, ইসলাম রক্ষার দায়িত্ব না আপনার, না আমার। এর দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন। আমাদের দায়িত্ব শুধু ইসলামের সহীহ পরিপূর্ণ দাওয়াত মানুষের সামনে তুলে ধরা। এবং যাবতীয় শির্ক, কুফর থেকে বেঁচে থেকে নিরেট তাওহীদের দিকে মানুষকে আহ্বান করা। সুতরাং
মানব রচিত ব্যবস্থা গণতন্ত্র সহ সকল ত্বগুতি ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দ্বীনকে বিজয়ী করার চেষ্টাকারীদের অনুধবনের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, গণতন্ত্র সহ সকল প্রকার মানব রচিত ব্যবস্থার অধীনে কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাইলে তাকে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্বের পরিবর্তে মানুষের সার্বভৌমত্ব মেনেই অংশগ্রহণ করতে হয়, যা সুস্পষ্ট শির্ক ও কুফর; এটা কোনভাবেই ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা (খিলাফত) লাভ তথা আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার পথ ও পদ্ধতি হতে পারে না। এর বাস্তব দলিল হিসেবে নব্বই দশকের পর মিশর, তিউনিশিয়া, মরক্কো ও তুরস্কে নিজস্ব ইজতেহাদের ভিত্তিতে মানব রচিত ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ইসলামী দলসমূহের পরিণতি উল্লেখ করা যায়। উল্লিখিত দেশসমূহে ইসলামী দলগুলো মানব রচিত ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জনগণের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করার মাধ্যমে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরও ইসলামের আইন-বিধান সমাজ ও রাষ্ট পরিচালনায় প্রতিষ্ঠা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া আল-কুরআন ও সহীহ্ সুন্নাহ্ হতে একথা প্রমাণিত যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা তাঁর সহচরগণ কখনোই নিজেকে বা মুসলিমদেরকে রক্ষার জন্য ঈমান ও ইসলাম বিসর্জন দেননি কিংবা ইসলাম রক্ষার নামে সামান্যতম শির্ক ও কুফরকে প্রশ্রয় দেননি।

ইনসাফপূর্ণ খিলাফত ব্যবস্থা পূনঃপ্রতিষ্ঠার তামান্না যারা অন্তরে লালন করে ধারণ করে আছেন দিনের পর দিন রাতের পর রাত তাদের চিন্তা-ফিকির করার সময় এসেছে- তাহলে যারা শত শত বছর ধরে ক্বিতাল, সশস্ত্র সংগ্রাম, বোমাবাজি, সেনা ক্যু’র মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করে খিলাফত পূনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন কিংবা মানব রচিত ত্বগুতি ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভের বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তারা কি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়েও অধিক রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দুরদর্শীতার অধিকারী?!

নীচে কয়েকটি ঘটনাপ্রবাহ আমাদের চেতনা ফেরানোর জন্য উপস্থাপন করলাম, আল্লাহ্ আমাদের অনুধাবনের ইন্দ্রীয়কে সক্রিয় করে দিন।

১) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন গোত্রের গোত্রপ্রধানের কাছে মাক্কী জীবনে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নুসরাহ বা সহায়তা প্রার্থনা করেন। এদের মধ্যে কেবল মদীনার আউস এবং খাজরাজ গোত্র ব্যতীত সকলেই সমঝোতার নামে কিছু না কিছু শর্ত জুড়ে দেন। অর্থাৎ, ইসলাম ও কুফরের সহাবস্থান করার শর্ত। কিন্তু, এদের কারো থেকেই তিনি সহায়তা গ্রহণ করননি। এই ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে, “ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম ও কুফরকে সহাবস্থানে রাখলে আস্তে আস্তে একসময় ইসলাম আসবে” এই নীতি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১৪০০বছর পূর্বে বর্জন করেছেন।

২) আমরা সবাই জানি যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে মক্কায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বা একত্ববাদ তাওহীদের বাণী প্রচারের প্রথম থেকেই মুশিরক নেতৃত্ব তাকে শত প্রলোভন দেখিয়ে সহীহ্ দাহওয়াতের প্রচার থেকে দূরে সরাতে চেয়েছে। তারা তাঁকে মক্কার সবচেয়ে সুন্দরী রমণী, কা’বা গৃহের চাবি, অঢেল সম্পত্তি এমনকি “দার-উন-নাদওয়া” এর পদে বসানোর মতো লোভনীয় প্রস্তাবও দিয়েছিল। জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, “আমার এক হাতে সূর্য এবং আরেক হাতে চন্দ্র এনে দিলেও আমি মহাসত্য প্রচার হতে বিমুখ হব না।” যখন তাকে ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা, ওমাইয়া ইবন খলফ বলেন, “আসেন আমরা পরস্পরের মধ্যে শান্তিচুক্তি করি যে, এক বছর আল্লাহর ইবাদত করবো আর এক বছর দেব-দেবীর পূঁজা করবো।” তখন আল্লাহ্’র পক্ষ হতে নির্দেশ আসলো, হে মুহাম্মাদ বলে দিন- “তোমাদের (কাফিরদের) দ্বীন (ও কর্মফল) তোমাদের জন্য, আমাদের দ্বীন (ইসলাম) আমাদের জন্য।” [সূরা কাফিরুন ১০৯:০৬]। অথচ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কাফির-মুশরিকদের পক্ষ হতে এই প্রস্তাব পেয়েছিলেন তখন মক্কায় মুসলমানদের অবস্থা ছিল অবর্ণনীয় চরম দুর্বিষহ।

৩) “ইসলামকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরাসরি কুফরী ব্যবস্থার বিরোধীতা না করে একটু একটু করে ইসলাম আনতে পারলে ক্ষতি কী?” যুক্তি খারাপ নয়, তবে বাস্তবতার নিরীখে যুক্তিদাতারা মানুষের সার্বভৌমত্ব ভিত্তিক গণতন্ত্র, সুদী ব্যাংকিং, শেয়ার ব্যবসা বর্জন করা তো দূরের কথা, বরং ইসলামের সাথে লিঙ্ক করে এসব কুফরী মতবাদের ইসলামী সংষ্করণ বের করে রীতিমত নিজেদের অনিচ্ছায় ইসলামের জায়গায় কুফরের উপকার করে চলছেন।

৪) আমরা কিভাবে ভুলে যাই, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো মুশরিকদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে দার-উন-নাদওয়ার সদস্য হয়ে একটু একটু করে ইসলাম আনার চিন্তা করেননি! তিনি তো লোক দেখানোর জন্য বা মুসলিমদের পক্ষে সহানুভূতি বাড়ানোর জন্য কা’বার মূর্তির গায়ে কখনও হাতও বুলাননি, উপাসনা তো দূরের কথা।

সুতরাং আমাদের তথাকথিত জিম্মাদারদের এত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই যে, তাদের মৃত্যু হলে ইসলামের কী হবে? কিংবা তারা যেন তেন উপায়ে ইসলামকে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করে যেতে না পারলে মৃত্যুর পর আল্লাহ্’র নিকট কী জবাব দিবেন? বরং তাদের বুঝা উচিত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ৩১৩ জন সাহাবী যখন বদরের যুদ্ধে তিনগুণ সমর সজ্জিত কাফির বাহিনীর সামনে উপনীত হন, তারা কিন্তু চিন্তা করেননি যে “আমরা মারা গেলে ইসলাম রক্ষা কে করবে”? কিংবা আবু জাহেল, আবু লাহাব গংদের প্রস্তাব গ্রহণ না করলে নওমুসলিমদের দুর্বিষহ অবস্থা হতে উত্তরন কিভাবে সম্ভব হবে?” 

সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহ্র একক সার্বভৌমত্ব এবং দ্বীন-ইসলাম’-এর হুকুম-বিধান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভের জন্য আল্লাহ্র রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত পদ্ধতি-

আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন তাঁর জমীনে তাঁর মনোনীত একমাত্র দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা ও প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যে বান্দাদের মধ্য হতে কাদেরকে খিলাফতের দায়িত্ব প্রদান করবেন সে সম্পর্কে অন্যত্র ফরমান-

‘‘তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে খিলাফত (রাষ্ট্রক্ষমতা বা শাসনকর্তৃত্ব) দান করবেন যেমন তিনি খিলাফত (রাষ্ট্রক্ষমতা বা শাসনকর্তৃত্ব) দান করেছিলেন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে এবং তাদের জন্য মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে দিবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের (বর্তমান) ভয়-ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। তারা শুধু আমার ইবাদাত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর যারা এরপর কুফরী করবে তারাই ফাসেক।’’ (সূরা আন নূর ২৪:৫৫)

খিলাফত প্রসংগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

“তোমাদের মধ্যে নবুওয়াত থাকবে যতদিন আল্লাহ ইচ্ছা করেন। অতঃপর তা উঠিয়ে নেবেন। এরপর নবুওয়াতের তরীকায় খেলাফত কায়েম হবে। আল্লাহ পাক যতদিন ইচ্ছা তা রেখে দেবেন। অতঃপর উঠিয়ে নেবেন। অতঃপর অত্যাচারী রাজাদের আগমন ঘটবে। আল্লাহ পাক স্বীয় ইচ্ছামত তাদেরকে বহাল রাখবেন। তারপর উঠিয়ে নিবেন। অতঃপর জবর দখলকারী শাসকদের যুগ শুরু হবে। আল্লাহ পাক স্বীয় ইচ্ছামত তাদেরকে বহাল রাখবেন। অতঃপর উঠিয়ে নেবেন। এরপরে নবুওয়াতের তরীকায় পুনরায় খেলাফত কায়েম হবে। এই পর্যন্ত বলার পর আল্লাহ’র রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চুপ হয়ে গেলেন” (মুসনাদে আহমাদ হা/১৮৪৩০, সিলসিলা ছহীহাহ হা/৫; মিশকাত হা/৫৩৭৮)।

সমাধান স্পষ্ট- রাসূলুল্লহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়তী জিন্দেগীর দওয়াতী ক্রমধারায় চেষ্টা চালিয়ে গেলেই ঈমনদারগণ কাঙ্খিত সফলতা লাভ করবে।

আর সে দাওয়াতী ক্রমধারা হচ্ছে- ঈমান ও ইসলাম কবুলকারী ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গ অবশিষ্ট লোকদেরকে দাওয়াত দিবে,

প্রথমতঃ “হে লোকসকল! আপনারা ‘সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব মানুষের’ এই মহামিথ্যা ত্যাগ (অস্বীকার ও অমান্য) করুন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রসহ জীবনের সকল দিক ও বিভাগে ‘সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকৃশ কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ্’র’ এই মহাসত্য মেনে নিন, গ্রহণ করুন ও রব্বুনাল্লাহু ঘোষণা দিন।

দ্বিতীয়তঃ হে লোকসকল! আপনারা এই বিশ্বজোড়া যত মানব রচিত সংবিধান আছে সেসব সংবিধানের আনুগত্য অস্বীকার করুন এবং দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা একমাত্র আল্লাহ্’র করার অঙ্গীকার করুন আর সাক্ষ্য দিন- আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্।

তৃতীয়তঃ হে লোকসকল! মানুষের তৈরী সংবিধান ও আইন-বিধানের ভিত্তিতে যারা নেতা-নেতৃ বা সরকার, তাদের আনুগত্য অস্বীকার করুন এবং শর্তহীন আনুগত্য-অনুসরণ ও অনুকরণ একমাত্র আল্লাহ্’র রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর করার অঙ্গীকার করুন আর সাক্ষ্য দিন- আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্। এই তিনটি বিষয়ের দাওয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের সার্বভৌমত্ব এবং মানব রচিত ব্যবস্থা ও মানব রচিত ব্যবস্থার ধারক-বাহক নেতৃত্বের আনুগত্যের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের প্রতি ঈমান গ্রহণ এবং তাঁরই প্রদত্ত ব্যবস্থার আইন-বিধান পালনের অঙ্গীকারের মাধ্যমে যারা দাওয়াত কবুল করবে, তাদেরকে নিয়ে সহীহ্ আমীরের নেতৃত্বে “ইসলামী সমাজ” গঠন আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। এই দাওয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে মানব রচিত ব্যবস্থার ধারক-বাহক বাতিল নেতৃত্বের পক্ষ হতে আগত সকল প্রকার যুলুম-নির্যাতন ও বিরোধিতার মোকাবিলা করার দায়িত্ব মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের নিকট ছেড়ে দিয়ে উত্তম ধৈর্য্য ও ক্ষমার নীতিতে অটল থাকতে হবে। উপরন্তু বিরোধীতাকারীদের আচরণে রাগ না করে, পাল্টা গালি না দিয়ে, পাল্টা আঘাত না করে তাদের হিদায়াতের জন্য মহান রব্বের দরবারে বেশী বেশী দু’আ করতে হবে। এরই এক পর্যায়ে ঈমানদারদের জন্য ঈমানের চূড়ান্ত পরীক্ষা আসবে। অর্থাৎ মানব রচিত ব্যবস্থার ধারক-বাহক নেতৃত্ব যখন দেখবে ঈমানদারগণের দাওয়াতের কারণে তাদের জাহিলি সমাজের ঐক্য বিনষ্ট হয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে এবং ইসলামী সমাজ গড়ছে তখন তারা এ দাওয়াত বন্ধের জন্য ঈমানদারদেরকে নিশ্চিহ্ন ও স্তব্ধ করে দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। হতে পারে তা জেল-যুলুম থেকে শুরু করে মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত। জাহিলিয়্যাতের পক্ষ থেকে আসা ঈমানের এ সর্বোচ্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে আল্লাহ্ নিজেই তাঁর বিশেষ সাহায্যে মানব রচিত ব্যবস্থার ধারক-বাহক নেতৃত্ব তথা জাহিলিয়্যাতের পতন ঘটিয়ে ঈমানদার সৎকর্মশীলদেরকে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা দান করবেন। আর তখনি ঈমানদারগণ সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও দ্বীন-ইসলামের আইন-বিধান চালু করবেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন তাঁর কিতাব আল-কুরআনে সূরা আন্ নূর’এর ৫৫ নং আয়াতে সুস্পষ্ট পথনির্দেশ দিয়েছেন।

সুতরাং সকল ধর্মের লোকদের জন্য যার যার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের সুযোগ রেখে আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত পদ্ধতিতে সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব এবং ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠিত হলেই দুর্নীতি, সন্ত্রাস, উগ্রতা, জঙ্গিতৎপরতা ও নৈরাজসহ সকল অপতৎপরতা নির্মূল হয়ে মানুষের জীবনে শান্তি ও কল্যাণ ফিরে আসবে, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সকল মানুষের সকল অধিকার আদায় ও সংরক্ষণ হবে।

মানবতার কল্যাণে বার্তাটি শেয়ার করুন-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *